কানাডা দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলছে আবাসন সংকট

দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলছে আবাসন সংকট


স্টাফ রিপোর্ট

 

টরেন্টোর ছোট্ট একটা এপার্টমেন্টে বাস করেন ২৭ বছর বয়সী আনা স্মিথ ও তাঁর সঙ্গী। আনা পরিবার গড়ে তুলতে চান। কিন্তু সন্তান লালন পালন করতে বাসায় যথেষ্ট জায়গার প্রয়োজন। শহরের পূর্ব দিকের শেষ প্রান্তে মাত্র ৫০০ বর্গফুটের এই এপার্টমেন্টের জন্যই মাসে গুনতে হয় ১৫৫০ ডলার।

 

বিশোর্ধ বা ত্রিশোর্ধ আরো অসংখ্য কানাডিয়ানের মতো আনাও মনে করেন বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এটা সম্ভব নয়। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আনার ধারণা কমপক্ষে আরও দু'বছর অপেক্ষা করতে হবে। এটা তার জন্য এক কঠিন পরিস্থিতি।

 

"মা-বাবার চল্লিশোর্ধ বয়সে আমার জন্ম হয়েছিল। তাঁরা অত্যন্ত ভালো বাবা মা। কিন্তু আমি মনে করি সময়ের থেকে তাঁরা কিছুটা পিছিয়ে ছিলেন। এজন্য সবসময় আমার সন্তানদের একটা ভিন্ন শৈশবকাল দিতে চেয়েছি।"

 

“কিন্তু জীবনের এখনকার এ বাস্তবতায় মনে হচ্ছে কোথায় যেন আটকে গেছি। ইচ্ছা পূরণের এ মাইলফলকে পৌঁছতে অত্যন্ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক।”

 

পরিসংখ্যান কানাডার হিসাবে, ২০২২ সালে নারী প্রতি জন্ম হার ছিল ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ যা বিগত ১০০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে কম। দেশের যুব জনগোষ্ঠী মূলত আর্থিক সামর্থ্যের কারণে ইচ্ছা অনুযায়ী সন্তান গ্রহণ করতে পারছে না। প্রায় ৩৮ শতাংশ যুব জনগোষ্ঠী যাদের বয়স ২০ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে মনে করে, আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় আগামী ৩ বছরের মধ্যে সন্তান নেয়ার মতো অবস্থানে তারা নেই।

 

কানাডিয়ান রিয়েল এস্টেট এসোসিয়েশন এবং এবাকাস ডাটা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ৩,৫০০ কানাডিয়ান নাগরিকের মধ্যে যৌথভাবে এক সমীক্ষা পরিচালনা করে। সমীক্ষায় ৫৫ শতাংশের বেশি যুব জনগোষ্ঠী যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে জানায়, আবাসন সংকটের কারণে তারা কখন সংসার জীবন শুরু করবে এ সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

 

এ জনগোষ্ঠীর ২৮ শতাংশ বলেছে, আবাসন সংকটের কারণে তারা সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রেখেছে। আবার ২৭ শতাংশ বলেছে, একই কারণে তারা হয়তো সন্তান গ্রহণ করবে না বা করলেও পরিবার খুব ছোট রাখবে।

 

কিচেনারের অধিবাসী ৩৭ বছর বয়সী জ্যাক রবিসাউদ বেড়ে উঠেছেন বড় পরিবারে। ছয় ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তাঁরও ইচ্ছা ছিল বড় পরিবার গড়ে তোলার। বর্তমানে তিনি ও তাঁর স্ত্রী পূর্ণ কালীন চাকুরী করেন। দু'জনের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় মাসে ২,০০০ ডলারের বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করতে। এ দম্পতির চার বছরের মেয়ে এভরি বেশির ভাগ সময় কাটায় একা খেলা করে। সংসারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে দ্বিতীয় সন্তান নেয়ার মতো সামর্থ্য তাঁদের নেই। এ দম্পতিকে ৩ সন্তানের বড় পরিবার গড়ে তোলার ইচ্ছা বাদ দিতে হয়।

 

কানাডা মর্টগেজ এন্ড হাউজিং কর্পোরেশন সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, কানাডাতে বসবাসের জন্য পছন্দমতো বাড়ি খুঁজে পাওয়া যেমন দুস্কর, ভাড়াও তেমনি আকাশচুম্বি। এটা ভুক্তভোগীরাই ভালো বলতে পারবে। সারাদেশে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অত্যন্ত কম। বাড়ির সংখ্যা যেমন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম, গড়ে ভাড়াও বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ।

 

সিবিসি নিউজ সম্প্রতি কানাডার বড় শহরগুলোর এক হাজার এলাকা বিশ্লেষণ করে বলেছে, দেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় বাজারে ভাড়ার জন্য খালি বাড়ির সংখ্যা এক শতাংশের কম। আবার তুলনামূলক একটু বড় বাড়ি অর্থাৎ একাধিক শয়ন কক্ষের বাড়ির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো খারাপ। বাজারে এগুলোর সংখ্যাও যেমন কম তেমনি ভাড়াও ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

 

দেসজার্দিনসের কানাডিয়ান অর্থনীতির জ্যেষ্ঠ্য পরিচালক রান্ডাল বার্টলেট মনে করেন, বর্তমান অবস্থায় বাড়ির দাম এবং ভাড়া কমানোর একমাত্র সমাধান হচ্ছে বাজারে সরবরাহ বাড়ানো। এটা করতে পারলে জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ প্রয়োজনীয় আবাসনের ব্যবস্থা সহজেই করে নিতে পারবে।