সীমান্ত থেকে কানাডা ফিরিয়ে দিচ্ছে হাজার হাজার বিদেশি
স্টাফ রিপোর্ট
মোহাম্মেদ কামিল শাইবু গত সেপ্টেম্বর মাসে এডমুনটনে একটি সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঘানা থেকে রওয়ানা হন। প্যারিস এয়ারপোর্ট থেকে বিমানে উঠতে যাবেন এমন সময় তাঁকে ডেকে জানানো হয়, কানাডার এক অভিবাসন কর্মকর্তা তাঁর সাথে কথা বলতে চান। ওই কর্মকর্তা টেলিফোনে তাঁর কর্মসংস্থান, এডমুনটনে যাবার কারণ ও ভিসা আবেদন বিষয়ে প্রশ্ন করেন।
শাইবু বলেন, “প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে আমার খুবই অসুবিধা হচ্ছিলো। আমি আতংকিত হয়ে পড়েছিলাম। এমনকি আমি কোন প্রশ্নের উত্তরে কি বলেছি সেটাও জানি না।” ওই কর্মকর্তা শাইবুকে কানাডাতে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁকে আক্রা ফেরত যেতে বলা হয়।
পরে ইমেইলের মাধ্যমে শাইবুকে জানানো হয় যে, তাঁর কানাডা ভ্রমণের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। তবে এতে সে ক্ষুব্ধ নয়। তাঁর ধারণা, কানাডা একটা ভালো দেশ যেখানকার মানুষ অত্যন্ত ভদ্র ও বন্ধু ভাবাপন্ন। ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে আবারো সে কানাডা যাবার চেষ্টা করবে।
এরকম অভিজ্ঞতা শুধু মোহাম্মেদ কামিল শাইবুর একার নয়। অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তনের কারণে কানাডা বর্তমানে সেদেশে ভ্রমণ করা বা অস্থায়ী বাসিন্দাদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ধরণের ঘটনা খুব সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নতুন ভিসা দেয়ার সংখ্যা কমিয়ে আনার পাশাপাশি সীমান্ত থেকে অসংখ্য মানুষকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
চলতি বছরের শুধুমাত্র জুলাই মাসে ৫ হাজার ৮৫৩ জন ভ্রমণকারীকে সীমান্ত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এদের সবাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্র, কর্মী ও পর্যটক হিসেবে কানাডাতে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০১৯ সালের জানুয়ারির পর এক মাসে এতো সংখ্যক মানুষকে কখনো ফেরত পাঠানো হয়নি।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের হিসাবে দেখা যায়, কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) কর্মকর্তারা প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৭২৭ জন ভ্রমণকারীকে এদেশে ঢোকার অনুমতি না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ক্যালগেরী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক গিডেন ক্রিশ্চিয়ান বলেন, ভিসা দেয়ার পরও যদি কোন ব্যক্তিকে কানাডাতে ঢুকতে দেয়া না হয় তবে সে ভিসার অনুমোদন দেয়া উচিৎ নয়। “কোন ব্যক্তি যখন আসবে, আপনি যদি তাঁকে ঢোকার অনুমতি দিতে না পারেন তবে কেন তাঁকে ভিসা দেয়া হবে ?”
কানাডার ৮ জন আইনজীবী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের মক্কেলদের কাছ থেকে বিমানবন্দর ও সীমান্ত পথে নানা ধরণের জেরা এবং কড়াকড়ি আরোপের কথা শুনেছেন তাঁরা।
ব্রিটিশ কলম্বিয়ার আইনজীবী উইল টাও বলেন, তাঁর ৬ জন মক্কেল কানাডা ভ্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তারা তাদের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছায় ফিরে যাবার পরামর্শ দেন। কেউ কেউ পরিণতি না জেনেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। উইল টাও বলেন, অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি পরিবর্তনের কারণে কর্মকর্তারা এখন ভ্রমণকারীদের সাথে বিপরীতমুখী আচরণ করছেন।
কানাডার অভিবাসন কার্যালয়ের হিসেবে ভিসা দেয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ২০২২ এবং ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মীদের সর্বোচ্চ সংখ্যক ভিসা দেয়া হলেও বর্তমানে সেটা অনেক কমে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মে এবং জুন মাসে ভিসা দেয়ার তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যক ভিসা প্রার্থীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
অভিবাসন মন্ত্রী মার্ক মিলার বলেন, "কানাডার মানুষ এমন একটা ব্যবস্থা চায় যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়।" মার্ক মিলারের মুখপাত্র জানান, গত জানুয়ারি মাস থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা অনুমোদন সীমিত করা হয়েছে। তবে কানাডাতে ২০২৩ সাল থেকেই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমতে শুরু করে।
ক্ষমতাসীন লিবারেল সরকার আগামী বছর ফেডারেল নির্বাচনকে সামনে রেখে স্থায়ী ও অস্থায়ী অভিবাসীদের সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে তীব্র আবাসন সংকট এবং দ্রব্যমূল্যসহ জীবন যাপনের অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্য অভিবাসীদেরকে দায়ী করা হয়ে থাকে।