টরেন্টোতে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর মুক্ত আলোচনা
স্টাফ রিপোর্ট
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটেছে বলে বক্তারা এক মুক্ত আলোচনায় অভিমত জানালেও রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক উদ্যোগ (পিডিআই) ২৬ জানুয়ারি টরেন্টোর ডেনফোর্থে হোপ ইউনাইটেড চার্চ মিলনায়তনে এ মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। সাবেক রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ছাড়াও টরেন্টোতে বসবাসরত নতুন প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশিরা আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনার সূত্রপাত করতে গিয়ে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈকত রুশদি বলেন, ৫ আগস্টের পর যা কিছু ঘটছে সেসবকে বৈধতা দিতে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। তবে সংবিধান সংশোধন নাকি পুনর্লিখন করা হবে সেটা আগে নির্ধারণ করতে হবে। সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে গেলে এ নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, নির্বাচনী বিধি পরিবর্তন করতে হবে যাতে ঢাকায় বসে মনোনয়ন দেয়া না হয়। মনোনয়নের এই ক্ষমতা রাজনৈতিক দলের স্থানীয় পর্যায়ে থাকা উচিত। দুর্নীতি বন্ধ করতে স্থানীয় প্রকল্পের সাথে সংসদ সদস্যদের সব ধরণের সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করতে হবে। তাঁদের বেতন বাড়ানো যেতে পারে কিন্তু জমি বা শুল্কমুক্ত গাড়ি দেয়ার নিয়ম বাতিল করতে হবে।
বিচার বিভাগ এখনো পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কেননা আমলাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রয়ে গেছে। জেলা প্রশাসকদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বাতিল করা উচিত, এ কথা উল্লেখ করে রুশদি বলেন, বর্তমান সংবিধানে সংসদ সদস্যদের দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু তাঁদের এই ক্ষমতা দেয়া উচিত।
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইনজীবী নুসরাত স্বাতী বলেন, “বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। গত ১৫ বছর আমরা দেখেছি বিচার বিভাগকে কিভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে। এটা ভারসাম্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা জায়গা যেখানে মানুষ অভিযোগ নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং এটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা না গেলে প্রত্যাশার আর কিছু থাকে না।”
সংবিধান পুনর্লিখনের প্রস্তাব করে তিনি বলেন, গত ১৫ বছর সংবিধানের এতোটাই পরিবর্তন করা হয়েছে যে, আগামীতে ছোট ছোট অনেক বিষয় আসবে যা সমস্যা তৈরী করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক নেতা নাসির উদ দৌজা বলেন, "আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে মৌলবাদীদের উত্থানের আশংকা করা হচ্ছে। এটা পুরোপুরি সত্য না হলেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দেখছি না।"
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কমিশনের সুপারিশ উচ্চাভিলাষী। এটা বাস্তবায়নযোগ্য কি না তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। তবে সংবিধান সংস্কারের আকাংখা নতুন নয়। রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের - আইনসভা, বিচার বিভাগ ও সরকার - পরিপূর্ণ বিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইনসভা করাও খুব জরুরি।
সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, অন্যতম প্রধান দল বিএনপি ও বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টির প্রস্তাব এবং সংস্কার কমিটির সুপারিশের মধ্যে পার্থক্য খুব কম।
পিডিআই সাধারণ সম্পাদক মনির জামান রাজু রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের তাগিদ দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলের চরিত্রের পরিবর্তন না হলে কোন পরিবর্তনই সম্ভব হবে না।
সাংস্কৃতিক সংগঠক আহমেদ হোসেন বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বিভিন্ন ধরণের স্ববিরোধিতা রয়েছে। সময়ের ব্যবধানে এসব সুপারিশ এক পর্যায়ে আবর্জনার স্তূপে পরিণত হবে।
বিদ্যুৎ রঞ্জন দে বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করেছে এবং একারণেই তাদের পতন হয়েছে। কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে আলাদা করতে চান। প্রকৃতপক্ষে এটা একটি মহলের কৌশল।
সাংস্কৃতিক কর্মী সৌমেন সাহা বলেন, "সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশে চার মূলনীতি পরিবর্তনের কথা বলে হয়েছে। সংবিধান সংস্কারের এ উদ্যোগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনধিকার চর্চা বলে আমি মনে করি।"
পিডিআই সভাপতি আজফর সৈয়দ ফেরদৌসের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন ফখরুল চৌধুরী মিলন, শাহীন হাসান, ফাতিন ইশরাক, মাহির আসহাব।