বৃহস্পতিবার, 23 মে 2024

পরিচ্ছন্ন কর্মী থেকে বড় অফিসার

বুধবার, 29 ডিসেম্বর 2021 00:00
ফিডব্যাক দিন
(0 votes)

মনজুর মাহমুদ

 

অভিবাসীদের দেশ কানাডা। পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের ঠাই মিলেছে এ দেশটাতে। বিচিত্র সব মানুষ, বৈচিত্র্যে ভরা তাদের অভিজ্ঞতা। একেক জনের গল্প একেক রকম। কোনো কোনো গল্পের চরিত্রগুলোতে অদ্ভুত মিল। নিজের দেশে শিক্ষা ও দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে এখানে শুরু করতে হয় আবার শূন্য থেকে। কেউ কেউ সফল হন। আবার ব্যর্থদের সংখ্যাও কম নয়। আজকের গল্প ভেনিজুয়েলায় জন্ম নেয়া যশুয়া আল্ভারেজ-কে নিয়ে।

 

অভিবাসী হয়ে কানাডায় আসার স্বপ্ন পূরণ করতে পুরো পাঁচটি বছর অপেক্ষা করতে হয় যশুয়াকে। ছিলেন তেল কোম্পানির বিপণন বিশেষজ্ঞ। পাশাপাশি প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করতেন। সাফল্যের কমতি ছিল না। তাঁরই ছাত্র ইজেকুয়েল ক্যারেরা টরন্টো ব্লু জেইসের তারকা খেলোয়াড়। কিন্তু টরন্টোতে আসার পর প্রথম কাজের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না যশুয়ার জন্য। টিকে থাকতে বেছে নিতে হয় টিটিসি’র (টরন্টো ট্রানজিট কমিশন) টয়লেট পরিষ্কার করার কাজ।

 

যে কোন কাজ করতেই প্রস্তুত ছিলেন যশুয়া। তবে দেশে তিনি যে কাজ করতেন, এদেশে সে ধরণের কাজ পেতে করা আবেদনগুলো থেকে সাক্ষাৎকারের জন্য একটিও ডাক পাবেন না এতোটা আশা করেননি। অতীত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বোঝা হয়ে গিয়েছিল। আর এ থেকে মুক্তি পেতে টিবিএম সার্ভিস গ্রুপে টয়লেট পরিষ্কার করার কাজ পেতে আবেদন করেন। টিটিসি’র অধিকাংশ স্থাপনাতে টয়লেট পরিষ্কার করার দায়িত্ব পালন করে কোম্পানিটি।

 

পরিষ্কার করার কাজ আগে কখনো করতে হয়নি যশুয়াকে। এটা ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, “নতুন অভিবাসীদের জন্য এটা সুখকর কোন অভিজ্ঞতা নয়। তারপরও যখন এ কাজ করতে শুরু করি, আমার সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করেছি……মুখে হাসি রেখে করার চেষ্টা করেছি। আগে করার অভিজ্ঞতা আছে এমন কাজ পাওয়া পর্যন্ত অনেকে এটাকে টিকে থাকার উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু আমার জন্য এটা বড় সুযোগের দরজা খুলে দিয়েছে।“

 

টিটিসি’র সাবেক প্রধান নির্বাহী এন্ডি বাইফোর্ডের সাথে এক অনুষ্ঠানে পরিচয় ঘটে যশুয়ার। এতেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। টিবিএমের প্রধান কর্তা ভ্যাল রামানন্দের সাথে কথা বলেন বাইফোর্ড। যশুয়ার ভাগ্যের চাকা গেল ঘুরে। রাতারাতি ঝাড়ুদার থেকে হয়ে গেলেন কেন্দ্র ব্যবস্থাপক। ‘আসলে কিছু কিছু মুহূর্ত একজন মানুষের বাকী জীবনে অনেক প্রভাব ফেলে...এটা সেরকম কিছু’ -- কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন যশুয়া।

 

তবে বাইফোর্ডের সাথে দেখা হওয়াটা কাঁকতলিয় ছিল না। সুযোগ দরজায় কড়া নাড়ে। কিন্তু এর সাথে আরো কিছু যোগ করতে চান যশুয়া, ‘সুযোগের কড়া নাড়ার জন্য দরজাটা তো থাকতে হবে। অর্থাৎ একের পর এক ইটের গাঁথুনি তুলে ভিত্তি তৈরি করতে হবে এবং সেই ভিতের ওপর বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। আর বাড়ির দরজা থাকলে তবেই না সুযোগ কড়া নাড়বে!’ সংসার চালাতে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন। ভর্তি হন টরন্টো ফিল্ম স্কুলে। চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর পড়াশোনা করার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করেন রজার্স টিভিতে। একইসাথে ক্যামেরাম্যান, পরিচালকের কাজ ছাড়াও অন্যান্য কারিগরি দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁদের এক অনুষ্ঠানে একদিন অতিথি হয়ে আসলেন বাইফোর্ড। সেখানেই তাঁর সাথে পরিচয়। বাইফোর্ড এক পর্যায়ে অবহিত হন যে, যশুয়া পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে টিটিসিতে কর্মরত। বাকিটা ইতিহাস।

 

যশুয়ার উপলব্ধি, ‘অনেক মানুষের সাথেই আপনার পরিচয় থাকতে পারে কিন্তু সঠিক মানুষটির সাথে যোগাযোগ ঘটা অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এটার অর্থ বিশেষ কিছু। এর মানে এই নয় যে, ভালো কাজ পেতে বড় কর্তাদের সাথে যোগাযোগ থাকতে হবে। আমি রাতে কাজ করি এবং একইসাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে টিভিতে কাজ করছিলাম এটা জেনে বাইফোর্ড অভিভূত হয়েছিলেন।‘ এদেশে আসার পর টিকে থাকার জন্য কাজ করতে গিয়ে হতাশ হওয়া উচিৎ নয়। সংসারটা ঠিক রাখার পাশাপাশি নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা এসব হাসিমুখে উপভোগ করতে পারলে সাফল্য আসবেই।

 

‘নিজেকে আমি সবসময় কানাডিয়ান ভেবে এসেছি। এদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মানুষ, মূল্যবোধকে ভালবেসেছি। বহু সংস্কৃতির এ পরিবেশ দারুণভাবে আকৃষ্ট করে আমাকে। জমকালো এক অনুষ্ঠানে আকর্ষণীয় অনেক চরিত্রের একজন হিসেবে নিজেকে কল্পনা করতে পারেন যা ঐ অনুষ্ঠানকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে। এটা কোন বিষয় নয় আপনি আগে কি করতেন কিংবা কোথা থেকে এসেছেন। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে....জীবন নতুন করে শুরু করার জন্য কানাডা একটা দারুণ জায়গা।‘

 

টিটিসি’র কেন্দ্র ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি যশুয়া বর্তমানে কানাডা স্টার টিভির প্রযোজক হিসেবে কাজ করছেন। পালন করছেন ‘কানাডা পিচ’ নামের অনুষ্ঠানটির সার্বিক দায়িত্ব। নতুন অভিবাসীদের বিভিন্ন শিল্পকর্ম প্রচারের পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে সহায়তা করা হয় এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

 

(Canadian Immigrant-কে দেয়া Joshua Alvarez - এর সাক্ষাৎকার থেকে তথ্য নিয়ে এ গল্পটি লেখা।)

 

পড়া হয়েছে 520 বার

আপনার মতামত জানান...

আপনার মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ

স্বত্ব © Canadar Khobor Inc.
সম্পাদকঃ শাহানা খান
নির্বাহী সম্পাদকঃ শাহরিয়ার সোহেব
ইমেইলঃ এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।
ফোনঃ +1 (647) 716-4529, +1 (416) 320-3070