বুধবার, 19 জুন 2024

বিদেশে কানাডিয়ান কোম্পানিগুলো কি করছে?

শনিবার, 09 অক্টোবার 2021 00:00
ফিডব্যাক দিন
(0 votes)

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

বাংলাদেশের এক মন্ত্রীকে বিলাসবহুল গাড়ী এবং ক্যালগেরী ও নিউইয়র্ক সফরের যাবতীয় খরচ ঘুষ দেয়ার জন্য কানাডার ক্যালগ্যারি-ভিত্তিক তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকো রিসোর্সকে ২০১১ সালে দোষী সাব্যস্ত এবং শাস্তি হিসেবে সাড়ে নয় মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। রায় ঘোষণার সময় আলবার্টার আদালতে বিচারক স্কট ব্রুকার বলেছিলেন, নাইকোর এ কাজ প্রতিটি কানাডিয়ান নাগরিকের জন্য অত্যন্ত লজ্জার এবং ক্যালগ্যারির সুনামের প্রতি গভীর ক্ষত।

 

মামলার বিবরণে বলা হয়, ঢাকায় কানাডিয়ান রাষ্ট্রদূত ডেভিড স্প্রাউল (তৎকালীন) গণমাধ্যমে এসব খবর দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং নাইকো’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাশিম শরিফের কাছে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে শরিফ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগের বিষয়টিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “এ ধরণের উপহার সবসময় দেয়া হয়ে থাকে। এটা নতুন কিছু নয়।“ বাংলাদেশে কোন কাজে কত টাকা খরচ হচ্ছে সে সম্পর্কে নাইকো’র প্রধান কার্যালয় থেকে সে সময় নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা হচ্ছিল। অনেকের মনে আছে, বাংলাদেশে ট্যাংরাটিলার গ্যাসকূপে ২০০৫ সালে দু’বার ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নাইকো পরিচালিত এ গ্যাসকূপের বিস্তীর্ণ এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে। আশেপাশের কৃষি জমি, খাবার পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এলাকার অসহায়, গরীব মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সে সময় নাইকো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেনকে ঘুষ দেয়ার পথ বেছে নিয়েছিল।

 

এসব ২০১১ সাল এবং তার আগের ঘটনা। হতে পারে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সে সময় নাইকো এ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। তবে এটি আদৌ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল কি না তার উত্তর মিলবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে, যে কারণে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ঘটনা। ‘দ্য কানাডা ব্রান্ডঃ ভায়োলেন্স এন্ড কানাডিয়ান মাইনিং কোম্পানীজ ইন ল্যাটিন আমেরিকা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি এসব কোম্পানীর নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের খনিতে এ দেশীয় কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং সক্রিয় প্রতিষ্ঠানের ৪১ শতাংশ কানাডিয়ান। সেখানকার ১৩টি দেশে ২৮টি কানাডিয়ান কোম্পানীর প্রকল্প এলাকায় ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংঘর্ষে ৪৪ জন নিহত, ৪০৩ জন আহত এবং এসব ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ৭০৯ জন গ্রেফতার বা আটক হয়েছে।

 

বিচার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা বিষয়ক প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খনি প্রকল্পে কানাডিয়ান কোম্পানীগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় কানাডা এখন ব্যাপকভাবে সমালোচিত। গত এপ্রিলে ল্যাটিন আমেরিকার ১৮০টি সংগঠন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে এসব কোম্পানীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে খোলা চিঠি দিয়েছে।

 

ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ওসগুড হল ল’ স্কুলের প্রফেসর এবং প্রতিবেদনের প্রধান গবেষক শিন ইমাই বলেন, কানাডিয়ান কোম্পানীগুলো কি করছে তা সবাই দেখছে। এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়টিকে সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। এসব কোম্পানীর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে একটা কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

 

বিদেশে কার্যক্রম চালানোর ক্ষেত্রে এসব কোম্পানীকে স্বেচ্ছায় সামাজিক দায়বদ্ধতা মেনে চলতে বলা হয়েছে, এ কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরণের সংঘাত কমানো বা দ্বন্দ্ব নিরসনে স্থানীয় মানুষ এবং কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ফেডারেল সরকারের একজন পরামর্শক আছেন। কিন্তু পরামর্শকের কার্যালয়ের কোন ক্ষমতা নেই। এ কার্যালয় কোন অনুসন্ধান বা এসব কোম্পানির কর্মকাণ্ডের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারে না।

 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কানাডার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানি রয়েছে। আইন অনুযায়ী, এসব কোম্পানির মূল্য সংবেদনশীল তথ্য জানানোর বাধ্যবাদকতা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণত এ শ্রেণীতে পড়ে না। বিদেশের প্রকল্পগুলোতে এসব ঘটনা প্রকাশ করার বাধ্যবাদকতা আইনে নেই। এ সুযোগে কোম্পানিগুলো মাত্র এক চতুর্থাংশ নিহতের সংবাদ এবং ১২ শতাংশ আহতের সংবাদ প্রকাশ করেছে। হার্ভাডে ২০১৪ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় কোন ধরণের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মূল্যে প্রভাব ফেলে।

 

খনিজ সম্পদ আহরনে নিয়োজিত বড় কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সমিতির সভাপতি পিয়েরে গ্র্যাটন এ বিষয়ে বলেন, কিছু কিছু কানাডিয়ান কোম্পানি এমন কিছু দেশে কাজ করে যেখানে দ্বন্দ্ব, সংঘাত তুলনামূলকভাবে বেশী এবং আইনের শাসন কানাডার তুলনায় অনেক দুর্বল। তবে বিদেশে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো কি করছে সেদিকে নজর রাখতে সরকারের একটা কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টাকে তিনি সমর্থন করেন।

 

উল্লেখ্য, নাইকো’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্যাম্পসন ২০১০ সালে ছিলেন কানাডার অন্যতম শীর্ষ বেতনভোগী কর্মকর্তাদের একজন যার আয় দেখানো হয়েছিল ১ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার। সে সময় নাইকো’র শেয়ার মূল্যের উল্লম্ফন ঘটলেও পরবর্তী বছরগুলোতে দাম কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। স্যাম্পসন ২০১৩ সালে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য হন।

 

স্থান-কাল-পাত্র ভিন্ন হলেও নাইকো’র বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাশিম শরিফ ঢাকায় কানাডিয়ান রাষ্ট্রদূত স্প্রাউলের উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে সে সময় যে উত্তর দিয়েছিলেন তার সাথে এ গবেষণা প্রতিবেদনের কোথাও আদৌ কোন মিল আছে কি?

 

পড়া হয়েছে 823 বার

আপনার মতামত জানান...

আপনার মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ

স্বত্ব © Canadar Khobor Inc.
সম্পাদকঃ শাহানা খান
নির্বাহী সম্পাদকঃ শাহরিয়ার সোহেব
ইমেইলঃ এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।
ফোনঃ +1 (647) 716-4529, +1 (416) 320-3070